Voice of Bengal
এই আনন্দময় পৃথিবীতে আপনি কি বিষাদগ্রস্থ কিংবা মানসিক অবসাদে ভুগছেন, কাজের প্রচণ্ড চাপ আছে অথবা আপনার ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত; তাহলে শুনুন আজ থেকে পাঁচ হাজার বছর আগে স্বয়ং অর্জুন ভীষণভাবে মানসিক অবসাদে বিধ্বস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে নানানভাবে সূত্র বা উপদেশ দিয়ে তখনকার মানসিক অবস্থা থেকে উদ্ধার করেছিলেন।অর্জুনকে উজ্জীবিত করেছিলেন যুদ্ধের জন্য এবং সেই যুদ্ধে বিজয়ী হন অর্জুন।
তাহলে ভাবুন সেই ক্রমাগতভাবে একই সমস্যা যুগ যুগ ধরে চলে আসছে এবং তার সমাধানের উপায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং গীতার মাধ্যমে আমাদের দিয়ে গেছেন। আমরা জেনেও না জানার ভান করে আছি। অথবা মনেপ্রাণে হৃদয়ের আকুতি হচ্ছে না। সমস্যা কিন্ত একই আছে। এখনও অনেকেই মানসিক অবসাদে বা অশান্তির মধ্যেই জীবন অতিবাহিত করছেন । তাই আমাদের সকলের উচিত গীতা পড়া এবং সকলকে পড়ার জন্য অনুপ্রেরণা দেওয়া। শ্রীমদ্ভগবদগীতা হল জীবনকে মধুময় এবং সুন্দরতম করে তোলার এক অপূর্ব গ্রন্থ। জীবনকে মধুময় এবং আনন্দময় করে তোলার সহজ উপায় এই গ্রন্থে পাই।
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা বা গীতা একটি সাতশো শ্লোকের একটি ধর্মগ্রন্থ, তাই একে সপ্তশতী বলে।
হিন্দুরা গীতাকে ভগবানের মুখনিঃসৃত বাণী মনে করেন। মানবধর্ম, দর্শন ও সাহিত্যের ইতিহাসে গীতা এক বিশেষ স্থানের অধিকারী। গীতার কথক শ্রীকৃষ্ণ হিন্দুদের দৃষ্টিতে ঈশ্বরের অবতার পরমাত্মা স্বয়ং। গীতায় তাকে বলা হয়েছে শ্রীভগবান। গীতা সমগ্র মানবজাতির জীবনচর্যা একটি ব্যবহারিক পথনির্দেশিকা।
গীতাকে মোক্ষশাস্ত্র নামেও অভিহিত করা হয়।
ভগবদ্গীতা মানবজাতির জন্য শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপহার। প্রকৃতপক্ষে তার উদ্দেশ্য ছিল মানবজাতিকে জড় জাগতিক অজ্ঞতা থেকে উদ্ধার করা। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে অর্জুন যখন কৌরবপক্ষে তার আত্মীয়দের বিরুদ্ধে লড়াই করতে ইতস্তত বোধ করছিলেন। তখন শ্রীকৃষ্ণ সত্য , কর্ম, জ্ঞান, ধ্যান এবং ভক্তির দর্শন তাঁর কাছে ব্যাখ্যা করেছিলেন, যার ফলে বিশ্বের অন্যতম বড় ধর্মগ্রন্থ ভগবদ্গীতার উৎপত্তি হয়।
আমরা সকলে ধর্মপরায়ণ। আমাদের যে হিন্দু ধর্ম - স্বামীজীর কথায় বৈদিক বা বৈদান্তিক ধর্ম তার ভিতরে কি আছে তা জানা আমাদের অবশ্য কর্তব্য।
স্বামী বিবেকানন্দ একবার কাশ্মীরে গিয়ে একজন দরিদ্র মুসলমান বৃদ্ধা রমণীকে প্রশ্ন করেছিলেন - 'মা, তোমার ধর্ম কি?' তাতে সেই রমণী বলেছিলেন 'খোদা কি মেহেরবানী সে ম্যায় তো মুসলমানি হু' অর্থাৎ ভগবানের দয়ায় আমি মুসলমান। সনাতন হিন্দু ধর্মের অধিকাংশ লোকই ঠিক এই ভাবে অনুভব করে না, যে ভগবানের অপার করুণায় আমরা হিন্দু। হিন্দু ধর্মালম্বীদের এই প্রশ্ন করা হলে অনেকেই ভালো করে কিছু বলতে পারবেন না। কিছু কেউ কিছু কাহিনী পুরাণ কাহিনী অথবা শিব, কালী ও দুর্গার ধারণা নিয়ে কিছু হয়তো বলতে পারবেন। আমরা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের ওপর সনাতন হিন্দু ধর্মের প্রভাব ফেলতে পারিনা কারণ আমাদের অনুভবের অভাব, ঈশ্বরের প্রতি টানের অভাব। আচারগত ভাবে আমরা হিন্দু ধর্মকে গ্রহণ করেছি। আমাদের অধিকাংশ ধর্মীয় অনুষ্ঠানই হচ্ছে আচারগত। কিন্তু বৈদিক ধর্ম কে আমরা বুঝতে পারি না কারণ বেদের ভাষা কঠিন, বোঝা সহজ নয়।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতার মাধ্যমে বেদান্ত তত্ত্ব উপস্থাপিত করেছেন যাতে আমরা বৈদিক ধর্মের যে শিক্ষা, সেই শিক্ষা লাভ করতে পারি। তাই গীতা হচ্ছে হিন্দুদের অবশ্য পাঠ্য গ্রন্থ। শুধু হিন্দু নয়, যে কোনও ধর্মের মানুষের জন্য এই গ্রন্থ টি প্রযোজ্য। এতে সাধারণ মানুষের কি করণীয় তার সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান হয়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কে খ্রিস্টপূর্ব তিন হাজার বৎসর পূবের মানুষ বলেই আমরা গ্রহণ করি । গীতার ধর্মে একটা নতুন কিছু রয়েছে যার জন্য তাকে সমস্ত বৈদিক ধর্মের সারসংগ্রহ বলা যায়।
গীতার প্রধান শিক্ষা হচ্ছে কর্মযোগ, শুধু তাই নয় একটু ভালোভাবে অনুশীলন করলে আমরা দেখতে পাবো এটি একটি অপূর্ব সমন্বয় গ্রন্থ। এর ভেতরে কর্মযোগ, জ্ঞানযোগ ও ভক্তিযোগের কথা বলা হয়েছে। বৈদিক ধর্মের যত কিছু চিন্তা ধারা ছিল সমস্ত চিন্তাধারাকে গ্রহণ করা হয়েছে।
আগেকার দিনে মতবাদ ছিল যে সংসার ত্যাগ করে সন্ন্যাসী হয়ে সমস্ত কর্ম ছেড়ে না দিলে জীবনের চরম উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে না। অর্জুনকে আমরা তাই বলতে শুনি আমি ভিক্ষাবৃত্তি অবলম্বন করব, সন্ন্যাস গ্রহণ করব, আমি যুদ্ধ করব না। তখন শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন - না, কর্মের প্রয়োজন আছে কর্ম ছেড়ে কেউ এক মুহুর্ত বাঁচতে পারে না। শরীর যতক্ষণ আছে কর্ম কতক্ষণ আছে। সেটা শারীরিক বা মানসিক কর্ম হতে পারে। কর্মের মধ্য দিয়েই - অর্থাৎ নিষ্কাম কর্মের দ্বারাই কর্ম বন্ধন মোচন হয়। চিত্ত শুদ্ধ হয়, সেই শুদ্ধ চিত্তে আত্মসাক্ষাৎকার হয়। কর্ম মানুষকে করতেই হবে, কর্ম ছাড়া মানুষ থাকতে পারে না। তাই কর্মের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি দিলেন দৃষ্টিভঙ্গিটাই পালটে দিলেন। ভগবান অর্জুনকে বলেছেন বলছেন "শাস্ত্রবিহিত কর্ম সর্বদা তুমি করো।"
তখন সাধনার নানা পন্থা ছিল। কেউ জ্ঞানসাধনা করত, কেউ ভক্তি সাধনা বা কেউ যোগ সাধনা। এসব পন্থা নিয়ে পরস্পর পরস্পরের মধ্যে দ্বন্দ্ব লেগেই থাকত। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ দেখিয়ে দিলেন যে সকল পন্থাকে সমন্বিত ভাবে গ্রহণ করতে হবে। কর্ম, ভক্তি, জ্ঞান ও যোগ এই চারটি প্রত্যেকটি পৃথক পথ। কিন্তু অবশেষে সব পথই এক তত্ত্বে মিলিত হবে। কর্ম সম্বন্ধে শ্রীকৃষ্ণ বললেন - 'অনাসক্ত হয়ে' কর্ম করলে মানুষ পরমগতি প্রাপ্ত হয়। গীতাতে বিভিন্ন ধরনের লোক নিয়ে (সাত্ত্বিক, রাজসিক, তামসিক) বিভিন্ন ধরনের আহার নিয়ে বিচার করা হয়েছে। কোন ধরনের লোকের কি খাবার ভালো লাগে এবং ইচ্ছে করলে মানুষ কিভাবে তমঃ থেকে রজঃ ও রজঃ থেকে সত্ত্বঃ তে যেতে পারে - তাও তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন। এইভাবে বিভিন্ন তত্ত্ব, সাধনা পন্থা, অধিকারী ভেদ, সাধকদের স্বভাব, রুচি - সবকিছু নিয়ে একটা পূর্ণাঙ্গ চিত্র করে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ সমন্বয় সাধন করেছেন।
গীতার মহিমা সম্বন্ধে প্রত্যেক গুণীজন (স্বামী বিবেকানন্দ, মহাত্মা গান্ধী, শ্রীঅরবিন্দ) ব্যাখ্যা করে গেছেন।
আসুন আমরা এই গীতা পাঠ শ্রবণ করি, এই সনাতন, সুমধুর সঙ্গীত যা অনন্ত কাল ধরে প্রবাহমান, তা যেন সকলের কানে পৌঁছে দিতে পারি, এবং আমরা যেন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই। জয় শ্রীকৃষ্ণ।
- Shri. Arobindo Bhatyacharya
